Thursday, 14 May 2015

ওরা - ৫

জন্তুটার হুঙ্কার যে অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যাবে এটা ওরা বুঝতে পেরেছিল। তাছাড়া, ওদের চিৎকার, আগুন এর আভা, পোড়া গন্ধ, এসব যে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এটাও ওরা আন্দাজ করেছিল। তাই যত তাড়াতাড়ি ওরা পারল ওই যায়গা থেকে দূরে সরে গেল। ইউনিভার্সিটির পিছনের দিকের রাস্তা দিয়ে বের হল ওরা। অন্য সময় হলে হয়ত লোকদের নজরে পরত ওরা, কিন্তু আজকে অন্য দিকে এতো ঝামেলা যে ভীড়টা ইউনিভার্সিটির দিকেই ছিল, ওদের কে কেউ পাত্তা দিল না।
এক দিক দিয়ে ওদের জন্য ভালো হল। যা ঘটে গেল, এরপর কিছুক্ষণ একলা থাকা দরকার ছিল ওদের।
হেঁটে হেঁটে বড় রাস্তা পর্যন্ত আসলো ওরা। বন্যা প্রথম মুখ খুলল। এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও ওর গলার স্বর শান্ত। “বহ্নি, তুমি ঠিক আছ?”
বহ্নি পুরা ঝাঁঝাঁয়ে উঠল। “যা হল এরপর কেউ ঠিক থাকে? কি রকম কথা বল তুমি?”
বন্যা রাগত ভাবে কিছু কঠিন কথা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলালো। বুঝতে পারল বহ্নি রগচটা মানুষ। এরকম মানুষের সাথে ওর কথা বাড়াতে ইচ্ছা করল না।
মৃত্তিকার ভয় খানিকটা কমেছে। ও বন্যা আর বহ্নির কথা শুনছিল। বুঝল বন্যা একটু ক্ষুণ্ণ হয়েছে বহ্নির কথায়। তারও মনে হল বহ্নি একটু বেশি করছে। বহ্নি তো একা ওই জিনিসটার সামনে পড়েনি, ওরা সবাই ছিল। সে বন্যার তরফ নিয়েই কথা বলল।
“আমরা সবাই ভয় পেয়েছি বহ্নি, তুমি এমন ভাব করছ যেন সব কিছু খালি তোমার সাথেই হল এই মাত্র। তোমার আগে আমি মরতে বসেছিলাম, খেয়াল আছে?”
ওর এই কথায় বহ্নির মুখের উপর একটা কাল ছায়া পরল। মৃত্তিকার দেখে একটু খারাপই লাগে। তার মনে হল ওর কথাটা একটু বেশি রুঢ় হয়ে গেল। বহ্নির কাঁধে আলতো করে হাত রেখে নরম গলায় বলল, “তুমি না থাকলে অবশ্য আমি আসলেই মারা পরতাম। থ্যাংকস।”
এই প্রথম বহ্নির মুখে হাসি ফুটে উঠে।
দেয়া পিছন থেকে হাত তালি দিয়ে উঠল। “গ্রেট, everyone’s happy. এখন কি আমরা কোন জায়গায় বসে শান্তি মত কথা বলতে পারি?”
বন্যাও রাজি হয়। কিন্তু তাকে চিন্তিত দেখায়। “আবার যদি আগের ঘটনার repeat হয়?”
“হবে না,” দেয়া মাথা ঝাকায়। বন্যা ওর দিকে কপাল কুঁচকিয়ে তাকায়। “how come?”
“দিনে একবারের বেশি হয়না,” দেয়া ভয়ঙ্কর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে একটা হাসি দেয়। বাকি তিন জন অবাক হয়ে ওর দিকে ফিরে তাকায়। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরও দেয়ার কি ভয় লাগে না? বহ্নি খানিকটা ঠাট্টা করেই বলে, “তুমি কিভাবে জানো আর হবে না?”
দেয়া জবাব দেয়, “আন্দাজ করলাম। আমার আন্দাজ মাঝে মাঝে লেগে যায়। এখন চল, ওই খাওয়ার দোকানটায় বসে খাই আর কথা বলি।”
চারজন গিয়ে একটা টেবিল দখল করে বসে। দেয়া সামনে রাখা মেনু দেখে খাওয়ার অর্ডার দেয়, ওর আসলেই অনেক ক্ষিধা লেগেছিল। বাকিরা চায়ের অর্ডার দেয় খালি, ওদের ক্ষুধাবোধ বলতে আর কিছু ছিল না।
দেয়ার আন্দাজের কারনেই কিনা, বাকিরা আস্তে আস্তে মনে সাহস পেতে থাকে, যে হয়ত এখন আর ওদের সাথে তেমন খারাপ কিছু হবে না। একটু আগে যা ঘটে গেল সেটা সবাইকে বেশ ভাবিয়ে তুলছিল, যদি দেয়ার খাওয়ার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল ওর সাথে একটু আগে কোন প্রাণহানি হওয়ার মত ঘটনা ঘটেইনি।
সবাই চুপ, কেউই প্রথম কথা শুরু করতে চায় না। অথচ সবারই মনে অনেক প্রশ্ন। ওদেরকে কি আক্রমণ করল, কেন করল, ওদের সবার একই রকম স্বপ্ন দেখা, সবচেয়ে বড় কথা বহ্নির হাত থেকে আগুন বের হওয়া, এগুলো কি হচ্ছে ওদের সাথে। আর ওদের সাথেই কেন? ওরা কেউ একজন আরেকজন কে চিনে না, নীতু পরিচয় না করিয়ে দিলে ওদের কারো জীবন একসাথে মিলতও না। তবে কেন?
মৃত্তিকা সবার মুখের দিকে একবার করে তাকায়। বুঝতে পারে, না চাইলেও ওদের কে এখন একসাথে একই রাস্তায় চলতে হবে। কিন্তু ওরা সবাই এক একজন এক এক রকম। ওরা কি পারবে একসাথে পা ফেলতে?

No comments:

Post a Comment

Got a quick question? Ask!

Name

Email *

Message *