Friday, 11 May 2012

ওরা -১


বহ্নি ধীরে ধীরে চোখ খুলল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আসে পাশে যতটুকু দেখা যায় দেখার চেষ্টা করল। সব কিছুই ঠিকমত আছে। বিছানার পাশে ছোট টেবিলে ঘড়িটা টিকটিক করে যাচ্ছে। ডিভিডিগুলো তাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। ডিভিডি বহ্নি সবসময়ই গুছিয়ে রাখে। দেয়ালে আনিমে ক্যারেক্টার আর সিনেমার নায়ক নায়িকাদের ছবি লাগানো। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে একটু আলো এসে ওর গালের উপর পড়ছিল। সব কিছুই তো স্বাভাবিক।
তাহলে ওর মনটা কেন ছটফট করছে? মুখ ধুতে ধুতে ভাবল বহ্নি। আজকে মিডটার্ম আছে, কিন্তু ভাল করে পড়া হয়নি, এজন্য? না, তা তো নয়। তাহলে কেন?
খাওয়ার ঘর থেকে ডাক আসলো। ‘বহ্নি! খেতে আসো! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো তোমার!’
‘ধ্যাত! আবার!’ কোনোমতে নাস্তা খেয়ে দৌড় দিল সে, ইউনিভার্সিটির দিকে।
*****
দেয়া দাঁত মাজতে মাজতে মাথা ঝাকাতে লাগলো একটা হিন্দি গানের তালে তালে। ওর গোলাপী রঙের শোবার ঘরটায় সকালের রোদ খেলা করছে। ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে বের হয়ে ঘড়িটার দিকে তাকাল। এখনও অনেক সময় আছে। কাপড় পড়ে, মেকআপ করে আস্তে ধীরে বের হল ঘর থেকে সে।
খাওয়ার টেবিলে আব্বু আর আম্মু বসে কথা বলছে। এমনকি ভাইয়াও আজ আছে, অন্য দিনের মত কাজে ছলে যায়নি। দেয়াও যোগ দিল। অন্যদিন সবার মাঝে কত কথা হয়, আজকে কি যেন হল, দেয়া চুপচাপ বসে থাকলো। তেমন একটা কথা বলল না। অন্যদিন গাড়ীতে যেতে যেতে ড্রাইভার ভাই এর সাথে কত কথা বলে, আজকে পুরাটা রাস্তা কেবল জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলো।
কিসের যেন একটা ভয় ওকে জেঁকে ধরেছে।
*****
‘আপু!’
মৃত্তিকা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। ‘আবার কি হল?’ ছোট যমজ দুই ভাইয়ের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন করল সে। দিন মাত্র শুরু হয়েছে, কিন্তু এখনই সে ক্লান্ত। সারাদিন কিভাবে পার করবে জানে না।
ভাই দুইটা একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে নালিশ করা শুরু করল। কিন্তু ওদের কথায় কান দিচ্ছিল না মৃত্তিকা। অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিল ওর মায়ের কথা। এদের কিভাবে সামলাত মা?
কোনোমতে দুজনকে শান্ত করে নাস্তা খাওয়াল, নিজেও খেল। তারপর তাদের টিফিন বানাতে হল, ব্যাগ প্যাক করতে হল, পানির বোতল ভরতে হল। সব কিছু করে ওদের নিয়ে বের হতে হতে প্রত্যেকদিনের মত আবার দেরি হয়ে গেল ওর। ভাই দুটাকে স্কুলে দিয়ে যতক্ষণে ইউনিভার্সিটি পৌঁছালো, ততক্ষণে ক্লাসের ২০ মিনিট পার হয়ে গেছে। কোনোমতে স্যারকে একটা জবাব দিয়ে পেছনের সারিতে বসে গেল সে।
আজব ব্যাপার হল, এত দৌড়াদৌড়ির মাঝেও ভেতর থেকে দুশ্চিন্তার ভাবটা দূর করতে পারল না সে।
*****
বন্যা চুপচাপ বসে রবীন্দ্রনাথের একটা গল্প পড়ছিল। ক্যাফেটেরিয়াতে এত হট্টগোলের মধ্যেও ওর মনোযোগ ভঙ্গ হচ্ছিল না। একনাগাড়ে পড়েই যাচ্ছিল। অতিরিক্ত মনোযোগের কারনে আহসান কখন ওর সামনে এসে বসল ও টেরই পেল না।
‘যদি খুব সমস্যা না থাকে তো পাঁচ মিনিটের জন্য কি আমার দিকে তাকাতে পার?’
বন্যা চমকে উঠে তাকাল। আহসান মিটমিট করে হাসছে। বন্যা একটু লজ্জা পেয়ে গেল। ‘না মানে, গল্পটা এত ভাল লাগছিল যে-’
‘যে আশেপাশের সব কিছু ভুলে বসে ছিলে।’ আহসান ওর কথা শেষ করে দিল। ‘নাও, তোমার চা।’
ছোট একটা চুমুক দিল বন্যা, মুখটা তার ভার।
‘রাজকুমারীর কি হয়েছে এই অভাগা কি তা জানতে পারে?’ আহসান প্রশ্ন করল।
ঘাড় নাচাল বন্যা। ‘যদি জানতাম, বিশ্বাস কর, সবচেয়ে আগে তোমাকেই বলতাম। কেন জানি অস্থির লাগছে খুব। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে খুব শীঘ্রই।’
‘হুম,’ আহসান ওর চায়ে চুমুক দিল। ‘বেশি চিন্তা কর না,’ ও বলল। ‘কিছু যদি ঘটেও, আর কেউ না থাকুক, আমি আছি তোমার পাশে।’
টেবিলের উপর রাখা ওর হাতটা আস্তে করে ধরল বন্যা। ‘এই ভরসাতেই তো আছি।’
*****
বিকেল বেলা হঠাৎ করে আকাশ কাল করে মেঘ জমতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। সাথে বাজ পড়তে লাগলো।
যদিও তারা জানতে পারল না, তবুও ঠিক একই সময়ে বহ্নি, বন্যা, দেয়া আর মৃত্তিকার বুকটা কেঁপে উঠল।
কি ঘটতে যাচ্ছে?

No comments:

Post a Comment

Got a quick question? Ask!

Name

Email *

Message *