Friday, 11 May 2012

ওরা - ২


গোল টেবিলটা ঘিরে চারজন বৃদ্ধা বসে ছিল। চারজনই নিশ্চুপ। তাঁদের মাঝে একজন কিছুক্ষণ পর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।
‘এখন?’ সে বাকি তিনজনের মুখের দিকে তাকাল।
‘দুইটা রাস্তা খোলা,’ দ্বিতীয়জন জবাব দিল। ‘হয় আমরা ওদের হাতে ধরা দিব, অথবা-’
‘অথবা কি?’ তৃতীয়জন জানতে চাইল।
‘অথবা কোন একটা উপায় বের করবো, যেন এই শক্তি ওদের হাতে না পড়ে।’ ধীর কণ্ঠে জবাব দিল চতুর্থজন।
সবাই আবার কিছুক্ষণ চুপ। প্রথমজনই আবার কথা শুরু করল। ‘আমাদের হাতে সময় কতটুকু আছে?’
‘খুব বেশি হলে দুঘণ্টা,’ তৃতীয়জন জবাব দিল। ‘আমরা কি ধরা দিব?’ আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল সে।
চতুর্থজন একবার করে সবার মুখের দিকে তাকাল। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে। বাকী তিন জন চিনে এই চেহারা। এত বছর একসাথে থাকার পর এতটুকু না বুঝতে পারা বোকামির লক্ষণ।
‘ধরা আমরা পরবই আজ রাতে, আমরা চাই বা না চাই,’ চতুর্থজন বলল, ‘কিন্তু যদি আমরা আমাদের শক্তিসহ ধরা পড়ি, আমাদের কথা ছেড়ে দাও, পুরো পৃথিবীর উপর একটা বিপর্যয় ঘটে যাবে। আর এই শক্তি ফিরিয়ে দেবারও কোন পথ নেই। যা আমরা করতে পারি তা হল এই শক্তিটা অন্য কাউকে দান করা।’
‘কিন্তু জেনে শুনে কে এই দায়িত্ব নিতে চাবে?’ দ্বিতীয়জন জানতে চাইল।
‘কাউকে জানানোর মত সময়টুকুও আমাদের নেই,’ প্রথমজন উঠে দাঁড়াল। দেয়ালের উপর একটা মানচিত্র রাখা ছিল, সেটা দেখিয়ে বলল, ‘আমি ঠিক করেছি কোথায় পাঠাব আমাদের এই শক্তিটাকে। ছোট একটা দেশ, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক। তারচেয়ে বড় কথা, ওইখানে কেউ খুঁজতে যাবে না
‘কোন দেশ?’ বাকিরা জানতে চাইলো।
প্রথমজন উত্তর দিল, ‘ভারতের পাশের দেশ। বাংলাদেশ।’
কিছুক্ষণের জন্য বাকিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এটা নিয়ে একটা তর্ক শুরু হতে যাচ্ছিল, কিন্তু তৃতীয়জন ঘড়ি দেখে ওদের থামাল। ‘হাতে বেশি সময় নেই,’ চিন্তিত কণ্ঠে জানাল সে, ‘আমাদের যা করার এখনি করতে হবে।’
আর দ্বিরুক্তি করেনা কেউইটেবিলটা ঘিরে বসে একজন আরেকজনের হাত ধরে। এরপর উপরের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে অদ্ভুত ভাষায় একটা মন্ত্র পড়তে আরম্ভ করে। সাথে সাথে বাংলাদেশের আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু করে। সাথে সাথে শুরু হয় বজ্রপাতসহ বৃষ্টি। এই দৃশ্য দেখেই দেয়া, মৃত্তিকা, বহ্নি আর বন্যার বুক কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল ওদের সাথে ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

*****

সারা রাত ভালো ঘুম হল না বহ্নির। ছটফট করল সারাটাক্ষণ। অদ্ভুত অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতে লাগলো। তার মনে হচ্ছিল সে আগুনের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে। এত আগুন কোথায় লেগেছে ধরতে পারল না সে। তৃষ্ণায় তার গলা শুখিয়ে গেল, কিন্তু এই ভয়াবহ স্বপ্ন থেকে জেগে উঠতে পারছিল না সে। হঠাৎ তার সামনে এসে হাজির হল এক বৃদ্ধা। তার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে কথা বলা শুরু করল।
‘তোমার ভিতর রয়েছে অনেক আবেগ, অনেক ক্ষিপ্রতা। রয়েছে এক ধরনের প্রবলতা যা সহজে কারো মধ্যে দেখা যায় না। তুমিই পারবে, এই আগুনকে নিয়ন্ত্রন করতে। প্রমান করো তোমার নামের সার্থকতা।’

*****

পানির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিল বন্যা। দম বন্ধ হয়ে আসছিলো তার। নিশ্বাস নিতে পারছিল না সে। এ কেমন আজব ধরনের স্বপ্ন?
এমন সময় তার সামনে দেখা দিল এক বৃদ্ধা। ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ তুমি,’ বৃদ্ধা বলল তাকে, ‘একই সাথে শান্ত ও অশান্ত। পানির মতই তুমি, তাই তোমার দখলেই আসবে এ উপাদান।’ মৃদু হাসল বৃদ্ধা, তারপর মিলিয়ে গেল পানির ভিতর।

*****

জোরে চিৎকার করছিল দেয়া, কিন্তু এই প্রচণ্ড বাতাসের শোঁ-শোঁ আওয়াজে কেউই মনে হয় তাকে শুনতে পারছিল না। ঘূর্ণিঝড়ের মত বাতাশ বইছিল তার চারপাশে, আর তার মাঝে উড়ছিল সে। হাওয়ায় তার চুল উড়ছিল। কখনও তো ভরশূন্য পরিবেশে থাকেনি, তাই ভয়ে কাঁপছিল সে। কিছু একটা আকড়ে ধরবে যে, সে উপায়ও নাই। এরকম ভয়ার্ত পরিবেশে যদি সে দেখে এক বৃদ্ধা স্থির হয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তখন ভয়ে অজ্ঞান হওয়া ছাড়া আর কি করতে পারে সে?
‘আমার কথা শুনতে পার।’ মহিলা যেন তার মনের কথা পড়তে পারছিল। হেসে বলল, ‘চঞ্চল তুমি, এত অল্পতেই ভয় পেলে চলবে? তুমি তো ছুটবে সবার আগে, বাতাসের বেগে। অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারিণী, তুমি রাজত্ব করবে বাতাসের উপর। এটাই হবে তোমার ক্ষমতা।’

*****

মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল বড় একটা মাঠের মাঝে। কোন আওাজ নেই, সব চুপচাপ। হঠাৎ তার চারপাশের মাটি ভাঙতে শুরু করল। উঠতে লাগলো পাহাড়ের পর পাহাড়। সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই জায়গাটাও উপরের দিকে বাড়তে শুরু করল। মৃত্তিকা অনেক উঁচুতে উঠে যেতে লাগলো। কিন্তু কোন ধরনের চিৎকার করল না সে, ছুটাছুটিও করল না, স্থির হয়ে দাঁড়ায়ে থাকলো। আতঙ্কে সে কোথাও নড়তেও পারছিল না। তার সমস্যা আছে, সে অনেক উপরে উঠতে পারে না, তার মাথা ঘোরে। কিন্তু এখন কিভাবে এই পাহাড়ের বেরে ওঠা সে থামাবে তা সে বুঝতে পারছিল না।
‘তুমি থামতে বললেই থামবে।’
মৃত্তিকা চমকে উঠল। তার পাশে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল, ‘তুমি বড় বেশি কোমল, কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার মধ্যে কাঠিন্যও আছে। ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ তুমি। মাটির ওপর আধিপত্য তুমিই বিস্তার করতে পারবে।’

*****

ঠাশ করে ঘরের দরজাটা খুলে গেল। কিছু বন্দুকধারী মানুষ ঢুকে পরল ঘরের ভিতর। তাঁদের পিছন পিছন আসল একজন লোক। শরীরের গঠন শক্ত তার, চুল ছোট করে কাটা। ভারী পায়ের আওয়াজ ফেলে গোল টেবিলটার কাছে এসে দাঁড়াল সে।
‘পালানোর চেষ্টা করনি দেখে খুশি হলাম,’ ঠাণ্ডা গলায় বলল লোকটা। ‘আসার করি আর কোন উলটাপালটা কাজ করবে না। চুপচাপ আমাদের সাথে চলে আসো।’
কোন কথা না বলে ওরা উঠে দাঁড়ায়। তারপর লোকগুলোর পিছু পিছু বের হয়ে আসে। যদিও তারা বুঝতে পারছিল তারা হয়তো আর বেশিদিন বাঁচবে না, তবুও এক ধরনের তৃপ্তি কাজ করছিল তাঁদের ভিতর।
অন্তত তারা আসন্ন বিপদ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।
কিন্তু বহ্নি, মৃত্তিকা, দেয়া আরে বন্যার জন্য এটাই ছিল যাত্রার শুরু।

No comments:

Post a Comment

Got a quick question? Ask!

Name

Email *

Message *