Friday, 11 May 2012

ওরা - ৩


ouch!
বহ্নি চমকায়ে উঠল। নীতু পাশে বসে মিটমিট করে হাসছে। মেকি রাগ দেখাল বহ্নি।
‘এভাবে কেউ ঘুম থেকে ডেকে তোলে? হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে তো!’
নীতু হা হা করে হাসল জোরে জোরে। ‘তোর এত সহজে হার্ট অ্যাটাক হবেই না!’ আরেকটা খোঁচা দিতে দিতে বলল নীতু, ‘হওয়ার থাকলে এতদিনে হয়ে যেত। তোর মাথা যা গরম!’
বহ্নি রাগতে গিয়েও আর রাগতে পারল না। নীতু যেভাবে হাসছিল সেটা ওর মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। নীতুর সাথে সাথে সেও হাসতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর টিচার ক্লাসে ঢোকাতে ওদের হাসি থামলও। থামার আরেকটা কারণও ছিল। স্যার মিডটার্মের খাতা দেয়া শুরু করেছে। এরকম টেনশনের সময় হাসা যায়না।
দেড় ঘণ্টা পর ক্লাস থেকে বের হল ওরা। যতটা খারাপ হবে ভেবেছিল ততটা হয়নি। নীতু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল বহ্নিকে, ‘এই, আজ ক্লাসে ঘুমাচ্ছিলি কেন? রাতে ঘুম হয়নি?’
বহ্নি হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘না। আসলেই হয়নি। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। আমি আগুনের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাচ্ছি। আর বুড়ি মত এক মহিলা আমাকে কি জানি সব বলছে।’
‘কি বলছে?’
বহ্নি কাঁধ ঝাকাল। ‘কি জানি! আমি খুব ক্ষিপ্র না ছাই, আবেগ আছে বা কিছু একটা। আমি কি এত মনোযোগ দিয়েছি নাকি? আঙ্গুল তুলে কি জানি বলছিল, এটাই মনে আছে। এইসব আজগুবি জিনিস দেখলে ঘুম কোনদিক দিয়ে ভালো হয় বল?’ আবার একটা হাই তুলল সে।
‘হুম,’ নীতু জবাব দিল। ঘড়ি দেখে বলল, ‘বহ্নি, যাইরে, নেক্সট ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। পরে আবার কথা হবে ঠিকাছে?’
‘ওকে, বাই!’
নীতু দৌড় দিল। ক্লাস শুরুর কয়েক মিনিট আগে পৌঁছাতে পারল সে। হাঁপাতে হাঁপাতে পেছনের দিকে একটা সীটে বসে পরল।
‘আজ এত দেরি হল যে?’ পাশের সীটে বসে থাকা বন্যা জিজ্ঞেস করল।
‘আর বলিস না, গল্প করতে করতে দেরি হয়ে গেছে।’
এর মধ্যে স্যার এসে পরায় ওদের কথা আর আগালো না। কিন্তু খাতায় নোট নিতে নিতে নীতু দেখল বন্যা কিছু একটা নিয়ে ভাবছে, ক্লাসে মন নেই, খাতায় কিছু লিখছেও না। নীতু একটা চিরকুট পাঠাল ওকে।
‘কি ভাবছিস?’
‘কিছু না,’ বন্যা লিখে পাঠাল।
‘অন্য দিনগুলোতে পাতা ভরে ভরে নোট তুলিস, আজ কিছুই লিখছিস না। ব্যাপারটা কি?’
‘রাতে ঘুম ভালো হয়নি। অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলাম। পানির মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। আর একজন মহিলা কি কি সব বলছে, যে আমি নাকি পানির মত। কিছুই বুঝলাম না, তবে ঘুম আর ভালো ভাবে আসলো না। এখন বিরক্ত লাগছে।’
বন্যা অবাক হয়ে দেখল যে নীতু চিরকুটটা পড়ে কেমন জানি থতমত খেয়ে গেল। একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না।
ক্লাস শেষে বন্যা জিজ্ঞেস করল নীতুকে এই ব্যাপারে। ‘আরে, কিছু না। তোর স্বপ্নটা weird, তাই আর কি,’ নীতু জবাব দিল। ‘এখন কি করবি?’
‘আমার তো এখন আর একটা ক্লাস,’ বন্যা ক্লান্ত গলায় বলল। ‘যেতে হবে।’
‘ঠিক আছে,’ নীতু মাথা নাড়ল। ‘ফোন দিস!’
‘হুম।’ বন্যা উল্টা দিকে হাঁটা দিল।
নীতু মিথ্যা বলতে চায়নি। কেন যে সত্যি কথাটা বলল না, যে ওর চেনা আরেকটা মেয়েও একই স্বপ্ন দেখেছে, বুঝল না সেটা। কিছুক্ষণ বন্যা যেদিকে গেল সেদিকে তাকিয়ে থাকলো সে, তারপর ঘুরে রওনা দিল কাফেটেরিয়ার দিকে।
দুপুর হয়ে গেছে। কি খাবে ভাবছিল নীতু, হঠাৎ কে জানি মোটামুটি ঝাপায়ে পরল ওর উপর।
‘নীতুউউউউউউ!!!’
না দেখেও বুঝতে পারলো নীতু কে এটা করল। ওই পাগলটা ছাড়া এটা কেউ করবে?
‘হ্যালো পাগলি, মনে এত রঙ লাগসে কেন জানতে পারি?’ ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জানতে চাইলো নীতু, ওর মুখে একটা হাসি বিস্তৃত হচ্ছিল আস্তে আস্তে।
‘কিইইই জানি!’ দেয়া কাঁধ ঝাঁকাল। বন্ধুর ঘাড়ে হাত রাখল। ‘তো তুই এখন আমাকে কি খাওাবি? ফুচকা? চটপটি? বিরিয়ানি?’
চোখ বড় হল নীতুর। ‘আমি কখন তোকে বললাম যে খাওয়াবো?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
meh, whatever. আমার ক্ষিধা লাগসে। খাওয়া।’
নীতু কি আর করবে। জানেই যে দেয়া একটা আধা পাগল মেয়ে, এমনি এমনি ছাড়বে না। যা চায় কিনে দিল ওকে, নিজেও খাবার কিনল। একটা খালি জায়গা পেয়ে বসে পরল দুই জনে। ক্ষিদাও লেগেছিল যথেষ্ট।
‘জানিস,’ গোগ্রাসে খেতে খেতে বলল দেয়া, ‘কাল রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম কি...ও কি? গলায় খাওয়ার আটকাল?’
নীতু কোনমতে কাশি থামাল। ‘তুই ও?’
‘মানে?’
‘না...কিছু না। বল কি বলছিলি।’ নীতু খেতে শুরু করল আবার।
‘না, আগে তুই বল। ‘তুই ও’ মানে কি?’ দেয়া জিদ ধরল।
নীতু খেতে লাগলো, কিছু বলল না।
‘বলবি না?’ দেয়া অধৈর্য হয়ে বলল।
‘আমার চেনা আরও দুই জন মেয়েও একই ধরনের স্বপ্ন দেখেছে। তাই অবাক হচ্ছি।’
‘ও।’
‘তা তোরটা কি রকম ছিল?’
‘আমি বাতাসের মধ্যে দিয়ে উরে যাচ্ছিলাম...’
‘আর তারপর এক মহিলা তোকে কিছু বলল?’
দেয়া বিস্ময়ে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। ‘ওরাও এমন দেখেছে?’
‘হুম।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল নীতু বলল, ‘আমার মনে হয় কি, তোরা তিন জন নিজেরা একটু কথা বল। কেন জানি মনে হচ্ছে তোদের এই কথাটা শেয়ার করা উচিৎ।’
‘কিন্তু আমি তো ওদের চিনি না!’
‘আমি চিনিয়ে দিব। কিন্তু আমার মনে হয় এই স্বপ্নের কথাটা শেয়ার করা দরকার।’
কিছুক্ষণ নীরব থাকে দেয়া। তারপর সম্মতি দেয় সে। ‘ঠিক আছে।’
নীতু উঠে পরে। খাওয়া শেষ ওর। ‘আমি তোকে ফোন দিয়ে জানাচ্ছি কোথায় মিট করতে হবে, ওকে?’
sure.’
ইউনিভার্সিটি এর পেছনের দিকে একটা গ্যালারি মত জায়গা আছে। নীতু ঠিক করে অখানেই সবাইকে দেখা করতে বলবে। সে ওখানে গিয়ে এক এক করে তিনজনকেই কল করে আসতে বলে। বন্যার সাথে কথা বলে মাত্র যখন ফোনটা রাখল তখন তার খেয়াল হল, মৃত্তিকা বসে আছে ওখানে একা একা।
নীতু ওকে খুব ভালো করে চিনেনা। ক্লাসে মাঝে মাঝে দেখে, অল্প কথা হয়। মেয়েটা খুব অমিশুক, বেশির ভাগ সময় ওকে একা দেখে নীতু। কিন্তু আজ যেন আরও বেশি গম্ভীর লাগছে ওকে।
নীতুর কি মনে হল, সে ওর পাশে গিয়ে বসল। ‘মৃত্তিকা,’ ও নরম গলায় ডাকল, ‘তুমি ঠিক আছো? খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে তোমাকে?’
‘ও, হাই নীতু। না, চিন্তিত আর কি, এমনি একটা জিনিস ভাবছিলাম।’
‘কি জিনিস?’
‘বললে তুমি হাসবে, ভাববে আমি কেমন!’
‘আচ্ছা হাসব না, প্রমিজ। বল?’
‘কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখলাম, আমার চারপাশে পাহাড় বেড়ে উঠছে। এমনিতেই আমার উচ্চতা নিয়ে প্রবলেম, আমি হাইট সহ্য করতে পারি না, ভয়ে আমার বুক কাঁপছে, তার উপর বুড়ি মত এক মহিলা-’
‘তোমার দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে কি জানি বলছে, রাইট?’
মৃত্তিকা ভীত চোখে তাকাল ওর দিকে। ‘তুমি কিভাবে জানো?’
নীতু দেখল বাকি তিনজনও ছলে এসেছে। ও জোরে একটা শ্বাস ফেলল। ‘তুমি ওদের সাথে কথা বল মৃত্তিকা। ওরাও একই ধরনের স্বপ্ন দেখেছে।’
সবাই একসাথে হওয়ার পর নীতু সবার সাথে সবার পরিছয় করিয়ে দিল। ‘আমার মনে হয় তোমাদের কথা বলা উচিৎ একজন আরেকজনের সাথে। কারণ তোমরা সবাই একই স্বপ্ন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেখেছ। এর মানে কি আমি জানি না, কিন্তু মনে হচ্ছে তোমাদের চারজনের সাথে কিছু একটা হচ্ছে বা হবে। যাই হোক, আমিও থাকতাম, কিন্তু ল্যাবে যেতে হবে আমাকে।’
সবাইকে বিদায় দিয়ে নীতু গেল। শুধু যদি ও জানত, কত বড় একটা ঘটনার সূচনা করে গেল ও!

No comments:

Post a Comment

Got a quick question? Ask!

Name

Email *

Message *