Friday, 25 May 2012

ওরা - ৪

মৃত্তিকা কথা বলা শেষ করল। কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। সবারই খুবই অবাক লাগছিল যে কিভাবে ওদের চার জনের স্বপ্নই এভাবে মিলে গেল। আর শুধু তাই না, একেক জন যেভাবে আগুন, পানি, বাতাস আর মাটি দেখল এটাও ওদের ভাবাচ্ছিল।
বন্যা প্রথম মুখ খুলল। 'ওরা কি বুঝাতে চাইছে যে আমরা এখন এই জিনিসগুলো কন্ট্রোল করতে পারি?'
দেয়া হাসল। 'তাহলে তো ভালই হয়। কিন্তু এটা লাইফ, মুভি না যে হঠাৎ করে আমরা পাওয়ার-পাফ গার্লস হয়ে যাব।'

বহ্নি মুখ বাঁকাল। 'first of all, powerpuff girls মুভি না, কার্টুন। আর ওদের আর যাই থাকুক না কেন, ওই চারটা জিনিসের উপর দখল ছিল না।'
'কে বলল?' দেয়া ঝাঁঝিয়ে উঠল। 'আমার স্পষ্ট মনে আছে একবার Blossom সকালে উঠে দেখল ও ফুঁ দিয়ে বরফ বের করতে পারছে!'
বহ্নি উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগে মৃত্তিকা তাকে থামাল। 'আমরা কি আসল ব্যাপার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না?' ও শান্ত গলায় বলল। 'যদি আসলেই আমাদের এখন এই ক্ষমতা হয়ে থাকে যে আমরা এই সব কন্ট্রোল করতে পারি, তাহলে এখন আমরা কি করবো?'
সবাই চুপ। কি বলবে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। মুভিতে এই ধরনের জিনিস দেখা এক জিনিস, আর আসল জীবনে এর মুখোমুখি হওয়া সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার।
'আর তাছাড়া,' বন্যা বলে উঠল, 'আমরা তো এখনও জানিও না যে আসলেই আমাদের এমন কোন ক্ষমতা আছে না কি না। হয়ত কাকতালীয়ভাবে সবার স্বপ্ন মিলে গেছে।'
'কাকতালীয়ভাবে কোন কিছু হওয়া এক ব্যাপার,' বহ্নি বলল। 'এটা মোটেও কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। নিশ্চয়ই কোন বড় ব্যাপার আছে এর পিছে।'
'আচ্ছা, তুমি সেটা জানো কেমন করে?' বন্যা বলল। ও যে স্বরে কথাটা বলল বহ্নির পছন্দ হল না। সামান্য কপাল কুঁচকায়ে বলল, 'এত রেগে যাচ্ছ কেন? খুব যে ভুল কিছু বলছি তাতো না।'
'কিন্তু তুমি যে ঠিক বলছো সেটারও তো কোন মানে নেই, তাই না?'
দেয়া একটু অবাক গলায় বলল, 'বন্যা তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন?'
হঠাৎ করে উঠে পড়ে বন্যা। 'কারণ এইসব আজগুবি ব্যাপারে মাথা ঘামানোর কোন ইচ্ছা আমার নাই!' জোরের সাথে কথাগুলো বলে ও। 'শান্ত সুস্থির একটা জীবন চাই আমি। একে এই স্বপ্ন, তার উপর এখন তোমাদের এইসব ridiculous থিওরি। তোমরা যা করার কর, আমি এর মাঝে নাই।' মাটিতে রাখা ব্যাগটা তুলে নেয় ও। এখানে থাকতে ওর আর এক মুহূর্তও ভালো লাগছে না। আহসানকে খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করছে এখনই। আর কারো সাথে এই মুহূর্তে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না বন্যার। এই স্বপ্ন এবং এটার কি অর্থ হতে পারে এসব নিয়ে ওর সাথে কথা না বলা পর্যন্ত বন্যা শান্ত হতে পারছে না।
কথা বলতে বলতে কিভাবে যে সময় পার হয়ে গেছে ওরা কেউই খেয়াল করেনি। এর মাঝেই জায়গাটা খালি হয়ে গেছে। ওরা ছাড়া আর কেউ নাই ওখানে। ঠিক যে মুহূর্তে বন্যা ঘুরে দাঁড়াল ছলে যাওয়ার জন্য, জোরে একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। আসেপাশে পড়ে থাকা টুকরা কাগজ, ছেড়া পাতা আরে একরাশ ধুলা উড়ায়ে নিয়ে গেল।
'উফ!' হাত দিয়ে চোখ ঢাকলো দেয়া।
বাতাসটা কিন্তু চলে গেল না। ওরা চারজন অবাক হয়ে দেখল যে বাতাসটা ঘূর্ণি খাচ্ছে এক জায়গায় স্থির হয়ে।
'um, আমি জানি না, কিন্তু বাতাস কি কখনও এমন আচরণ করে? বা করতে পারে?' দেয়া কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে।
'আমি যতদূর জানি, করার কথা না,' মৃত্তিকা জবাব দেয়। সে ভীত চোখে তাকিয়ে থাকে ঘূর্ণির দিকে। 'কিন্তু ওই স্বপ্ন দেখার পর, আর চারজনের স্বপ্ন মিলে যাওয়ার পর, আমি আশঙ্কা করছিলাম যে এমন কিছু একটা হতে পারে।'
'এমন কিছুটা কি?' বহ্নি জানতে চায়।
 হঠাৎ ঘূর্ণিটা থেমে যায়। তার জায়গায় ওরা দেখে এক ভয়ঙ্কর প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে বাঘের মত, কিন্তু আকারে তার তিনগুন। চামড়া পুরে গেলে যেমন রঙ হয় গায়ের রঙ সেরকম, নখগুলো যেন এক একটা আস্ত ছুরির ডগা, পাগুলো এক একটা গাছের গুড়ি। দেয়া আর বন্যা জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল। বহ্নির মুখ দিয়ে অজান্তেই একটা গালি বের হয়ে আসে, আর মৃত্তিকা পুরা চুপ। ভয়ে পাথর হয়ে গেছে সে।
'পালাও!' বহ্নির চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে আসে সবার, যে যেদিকে পারে দৌড় দেয়। বাঘটা বিকটভাবে গর্জে উঠে। কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে থাকে ওটার। লাফ দিয়ে এসে ওদের মাঝে পরল জন্তুটা। যে যেদিকে পারলো ছিটকে গেল।
হুঙ্কার ছারে বাঘটা। মাথা ঘুরিয়ে দেখে কার পিছে ছুটবে আগে।
'দেখা যাবে মুখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে এর পর,' বহ্নি মন্তব্য করে পালাতে পালাতে।
ওর চিন্তায় সামান্য ভুল ছিল।
দ্বিতীয় বার গর্জন দেয় বাঘটা। সেই সময় মুখ থেকে এক ধরনের তরল জিনিস বের হয়ে আসে। যেখানে ছিটকে পরল সে জায়গাটা সাথে সাথে পুরে যেতে থাকলো, যেন তরল পদার্থটা...
'ACID!!!' বন্যা সাবধান করে দেয় সবাইকে চিৎকার করে। 'ওর মুখ থেকে এসিড বের হচ্ছে!'
বহ্নি, বন্যা আর দেয়া বাইরে যাওয়ার রাস্তার মুখে চলে এসেছে প্রায়। তখনি বহ্নির খেয়াল হল। 'মৃত্তিকা কই?'
বাকি দুইজন ঘুরে তাকায়। 'ওই যে!' দেয়ার গলার স্বর কয়েক ধাপ উপরে উঠে গেছে ভয়ের চোটে।
মৃত্তিকা কোনায় আটকা পরেছে ইঁদুরের মত। বাঘটার লাফঝাঁপে এক জায়গার দেয়াল ভেঙ্গে গেছিলো, বড় বড় কয়েকটা ইটের টুকরা পড়ে মৃত্তিকার যাওয়ার রাস্তা আটকে দিয়েছে। একমাত্র একটা রাস্তাই খোলা, আর সেটা রুখে দাঁড়িয়ে আছে বাঘটা। বেচারি মৃত্তিকা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
'ও মারা যাবে, ওকে বাঁচাও!' দেয়া আর্তচিৎকার দেয়।
আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে বহ্নি দৌড় মারে। ওর মাথায় একটা চিন্তাই কাজ করছে, যেভাবে হোক মৃত্তিকাকে বাঁচাতে হবে।
'বহ্নি মারা যাবে তো!' বন্যা বলে উঠে। এদিন ওদিক তাকায়ে দেখে একটা পানির পাইপ, কলের সাথে লাগানো। 'দেয়া, হেল্প করো আমাকে।'
হাত কাঁপছে দেয়ার। কোনোমতে কলটা জোরে ছাড়ে ও। পাইপে পানির আওয়াজ পাওয়া যায়। বন্যা পাইপটা উঁচু করে ধরে। মনে মনে দোয়া করতে থাকে যেন নিশানা ঠিক হয়।
হঠাৎ করে সজোরে পানি বের হয়ে আসে, আঘাত করে প্রাণীটাকে। 'এটা করার কি মানে?' দেয়া জানতে চায়।
'যাতে বাঘটার মনোযোগ অন্যদিকে যায় আর বহ্নি মৃত্তিকাকে বের করে আনতে পারে।'
'বুঝলাম! কিন্তু ওর মনোযোগ তো এখন ছলে এসেছে আমাদের দিকে!'
আসলেই তাই। বাঘটা ঘুরে তাকায় ওদের দুজনের দিকে, চোখ দুটো যেন কয়লার টুকরা, জ্বলছে রীতিমতো। এই সুযোগে বহ্নি মৃত্তিকাকে বের করে আনে।
বাঘটা জোরে শ্বাস নেই। এরপর বড় করে মুখ খুলে, এসিড দিয়ে বন্যা আরে দেয়াকে আঘাত করার জন্য। 'ওরা মারা যাবে, ওরা এবার ঠিক মারা যাবে।' মৃত্তিকা বিড়বিড় করে।
বহ্নির মাথা গরম হয়ে উঠে। একে তো স্বপ্নটা দেখার কারনে রাতে ঘুম ভালো হয়নি, তার উপর সেই উদ্ভট স্বপ্ন আর স্বপ্নের বুড়ি, তারপর এই গোঁয়ার জন্তু। মাথা আর কাজ করে না বহ্নির, হাত দিয়ে মাথা আঁকরে ধরে সে।
'stop it, stop it,' সে বলতে থাকে, 'STOP IT!' চিলের মত চিৎকার করে উঠে সে, হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দেয়।
এরপর যা হল, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
বহ্নির হাত দুটো জ্বলে ওঠে। এক রাশ আগুন বের হয়ে আসে। চারদিকের বাতাস গরম হয়ে ওঠে, আগুনের হল্কায় চোখ খুলে রাখা যায় না। বহ্নির উঁচু করে ধরে রাখা হাত থেকে আগুন সজোরে নিক্ষিপ্ত হয়ে জন্তুটাকে ঘিরে ধরে। জন্তুটা বিকট চিৎকার করতে থাকে, পুরে যেতে থাকে আগুনে। পোড়া চামড়ার গন্ধে চারদিক ভরে উঠে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সব শেষ। মাটিতে পড়ে থাকে এক স্তুপ ছাই।
বহ্নি জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। ওর চোখ বড় হয়ে আছে। 'আমি...আমি এটা করলাম?'
'এটা... এটা...' দেয়া কথা শেষ করতে পারে না।
'আমরা ঠিক ভাবছিলাম তাহলে...' মৃত্তিকা বলে।
খালি বন্যা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পড়ে টনক নড়ে ওর। 'আমাদের এখান থেকে সরে পড়া উচিৎ। কেউ জিজ্ঞেস করলে কি জবাব দিব?'
সবাই আশেপাশে তাকায়। জায়গাটা ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। পড়া গন্ধ, ভাঙ্গা দেয়াল, গাছপালার ডাল ভেঙ্গে আছে। এরকম জায়গায় যদি কেউ ওদের দেখে তখন কি ভাববে বলাই বাহুল্য। চারজন তড়িঘড়ি করে পিছের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে পড়ে।
ওদের সামনে পড়ে আছে লম্বা এক রাস্তা। আর ওরা জানে না কিভাবে তা পার করবে।

No comments:

Post a Comment

Got a quick question? Ask!

Name

Email *

Message *